রথযাত্রা মানেই জয় জগন্নাথের ধ্বনি, ভক্তের ঢল আর হাতে এক প্যাকেট খাজা। কেউ বাড়ির জন্য কিনছেন, কেউ আবার মহাপ্রসাদ হিসেবে মাথায় ঠেকিয়ে গ্রহণ করছেন। কিন্তু এই সাধারণ দেখতে মুচমুচে মিষ্টিটি কীভাবে জগন্নাথদেবের ছাপ্পান্ন ভোগের অন্যতম প্রধান প্রসাদ হয়ে উঠল? প্রচলিত একটি ঐতিহাসিক ধারণা বলছে, এর গল্প শুরু হয়েছিল প্রায় ২,৩০০ বছর আগে।
রথযাত্রা শুধু একটি উৎসব নয়, কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাসের নাম। আর সেই বিশ্বাসের অন্যতম প্রতীক হলো মহাপ্রসাদ খাজা। পুরীতে জগন্নাথদেবের দর্শন যেন খাজা ছাড়া সম্পূর্ণই হয় না। কিন্তু এই মিষ্টির ইতিহাস জানলে অবাক হতেই হয়।

প্রচলিত ঐতিহাসিক মত অনুযায়ী, খাজার জন্ম মৌর্য সাম্রাজ্যের সময়। সে সময় রাজপরিবার ও বিশেষ অতিথিদের জন্য ময়দা, ঘি এবং চিনির রসে তৈরি এক বিশেষ স্তরযুক্ত মিষ্টি পরিবেশন করা হতো। পরে বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই মিষ্টি ধীরে ধীরে পূর্ব ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও এই দাবির পক্ষে চূড়ান্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, তবুও এটি বহুদিনের জনপ্রিয় ঐতিহ্যগত বিশ্বাস।
সময়ের স্রোতে ওড়িশার গজপতি রাজাদের আমলে খাজা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হয়ে ওঠে। পরে পুরীর শ্রীজগন্নাথ মন্দিরে এটি ছাপ্পান্ন ভোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিবেদন হিসেবে স্থান পায়। ভগবানের উদ্দেশ্যে নিবেদন করার পর এই খাজাই হয়ে ওঠে মহাপ্রসাদ যা ভক্তদের কাছে শুধু খাবার নয়, আশীর্বাদ।
খাজার আরেকটি বিশেষত্ব হলো, এটি দীর্ঘ সময় ভালো থাকে। তাই রথযাত্রার সময় লক্ষ লক্ষ ভক্ত সহজেই মহাপ্রসাদ হিসেবে এটি বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেন। আজও পুরীর বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে খাজা তৈরি করছেন। এই মিষ্টির প্রতিটি স্তরে যেন লুকিয়ে আছে ইতিহাস, বিশ্বাস আর সংস্কৃতির ছোঁয়া।
ইতিহাসবিদদের একাংশ অবশ্য মনে করেন, খাজার বর্তমান রূপ গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রভাবে। পারস্য ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু স্তরযুক্ত মিষ্টির সঙ্গেও এর মিল পাওয়া যায়। তাই খাজার উৎপত্তি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে এর গুরুত্ব নিয়ে কোনও মতভেদ নেই।
আজও রথের দড়িতে টান পড়লেই যেমন কোটি কোটি কণ্ঠে ধ্বনিত হয় “জয় জগন্নাথ”, তেমনই লাখো ভক্তের হাতে উঠে আসে এক টুকরো খাজা। কারণ, এটি শুধু একটি মিষ্টি নয় এটি জগন্নাথ সংস্কৃতির স্বাদ, শতাব্দী পেরিয়ে আসা এক ঐতিহ্যের স্মারক, আর কোটি ভক্তের অটুট বিশ্বাসের প্রতীক।





